শুক্রবার, ১ ডিসেম্বর ২০২৩, ১৭ অগ্রহায়ণ ১৪৩০ ঢাকা, বাংলাদেশ
সংবাদ

বীরাঙ্গনা বীর নারী

বীরাঙ্গনা বীর নারী

ফাইল ছবি

বাংলা ভাষার অভিধানে ‘বীরাঙ্গনা’ শব্দের অর্থ বীর নারী। ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে যাঁরা প্রবল সাহসের সঙ্গে লড়াই করেছেন তাঁরা বীরাঙ্গনা উপাধিতে ভূষিত হয়েছেন। এখনো মনে আছে একজনের নাম—‘বীরাঙ্গনা সুফিয়া’। বহুদিন এই নাম কলেজে পড়ার সময় বলতাম। মনে হতো, একজন বীর নারীর গৌরবের জায়গা বুঝি ধারণ করেছি। কিন্তু শব্দটি ব্যাপকহারে ব্যবহূত হতো না।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ধর্ষণের শিকার নারীদের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ‘বীরাঙ্গনা’ উপাধি দিয়েছিলেন। নিঃসন্দেহে তিনি চেয়েছিলেন এই শব্দটি ব্যবহারের মধ্য দিয়ে নারীকে বীরত্বের গৌরব দান করতে। কিন্তু দেশের সামাজিক-সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ নারীর জন্য প্রযোজ্য এই শব্দটি প্রত্যাখ্যান করে। সমাজ চায়নি এসব নারী মর্যাদার আসনে সমাজে পুনর্বাসিত হোক। উল্টো নির্যাতিত নারীরা অন্যের অপকর্মের দায়ভার নিজের কাঁধে তুলে নিতে বাধ্য হয়। সমাজের এই অরুচিকর, অমানবিক আচরণ সেসব নারীকে প্রান্তিক নারীতে পরিণত করে। অন্যদিকে সামাজিকভাবে বীরাঙ্গনা ধারণাকে গ্রহণ করলে নারীরা যে গৌরব ও অহংকার নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের অংশীদার হতে পারত তা এক বড় সংখ্যক নারীর জীবন থেকে মুছে যায়। সে সময়ে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করা গেলে নারীদের নানা সমস্যা সমাজের হুমকির মুখে প্রবল হয়ে উঠত না।

মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাসে লাখ লাখ নারী পাকিস্তানি বাহিনীর দ্বারা যৌন নির্যাতনের শিকার হন। পাকিস্তানের কারাগার থেকে দেশে ফিরে বঙ্গবন্ধু এই নারীদের অবস্থা জেনে মর্মাহত হন। কারণ বিজয় দিবসের পর থেকেই এই নারীরা পারিবারিক-সামাজিক-অমানবিক-অপরিশীলিত মূল্যবোধের সামনে মানসিক নির্যাতন ও অপমানের শিকার হন। শত্রুপক্ষ যুদ্ধকৌশল হিসেবে নারীদের নির্যাতন করে। বিশ্বজুড়ে এই ঘটনা ঘটে। কিন্তু বাংলাদেশের পরিবার ও সমাজ আমাদের নারীদের চরমভাবে লাঞ্ছিত করেছে। গর্ভবতী মেয়েটিকে মা-বাবা ঘর থেকে বের করে দিয়েছেন। নির্যাতিত স্ত্রীকে স্বামী ঘরে রাখেননি। এই দুঃসহ অবস্থা থেকে নারীদের উদ্ধার করার জন্য বঙ্গবন্ধু প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের পর ১৮ ফেব্রুয়ারি ‘নারী পুনর্বাসন বোর্ড’ গঠন করেন।

১৯৭২ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু পাবনা জেলার বসন্তপুর গ্রামে গিয়েছিলেন। বন্যার ফলে যে বাঁধ ভেঙে গিয়েছিল তার সংস্কার উদ্বোধন করেছিলেন সেদিন। মঞ্চে ওঠার সময় শুনলেন নারীকণ্ঠের কান্না জড়ানো শব্দ। ২০-২৫ জন নির্যাতিত নারী এসেছেন বঙ্গবন্ধুর কাছে তাঁদের শোচনীয় অবস্থার কথা জানানোর জন্য। তাঁদের কথা শুনে বঙ্গবন্ধু সঙ্গে সঙ্গে বললেন, ‘আচ্ছা মা, বিষয়টি বিশেষভাবে আমি দেখব।’ পরমুহূর্তে মঞ্চে উঠলেন। তাঁর ভাষণের এক জায়গায় বললেন, ‘আজ থেকে পাকবাহিনীর নির্যাতিত মহিলারা সাধারণ মহিলা নয়, তারা এখন থেকে বীরাঙ্গনা। মুক্তিযোদ্ধার চেয়ে তাদের অবদান কম নয়, বরং কয়েক ধাপ ওপরে।’ এই প্রসঙ্গে আরো বললেন, ‘তাই তাদের বীরাঙ্গনার মর্যাদা দিতে হবে এবং যথারীতি সম্মান দেখাতে হবে। আর সেই সব স্বামী বা পিতাদের উদ্দেশে আমি বলছি যে, আপনারাও ধন্য। কেননা এ ধরনের ত্যাগী এবং মহত্ স্ত্রীর স্বামী বা পিতা হয়েছেন। তোমরা বীরাঙ্গনা, তোমরা আমাদের মা।’ সেদিন থেকে নির্যাতিত নারীরা ‘বীরাঙ্গনা’ উপাধিতে ভূষিত হন। যার অর্থ বীর নারী। মুক্তিযুদ্ধের পরে মুক্তিযোদ্ধাদের যে সনদপত্র দেওয়া হয় সেই সনদপত্রটি দেখার সুযোগ হয় আমার। সেখানে লেখা হয়েছে ‘বীর/বীরাঙ্গনা সৈনিক’। বঙ্গবন্ধু নারী-পুরুষ-নির্বিশেষে সৈনিক হিসেবে উল্লেখ করার মর্যাদা দিয়েছেন।

বঙ্গবন্ধু সরকারের এই অবদান তাঁর স্বাধীনতার চেতনার মৌলিক বিশ্বাস। তিনি নারী-পুরুষকে সৈনিক হিসেবে উল্লেখ করার এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। এটি শুধু মুক্তিযোদ্ধাদের একসূত্রে আবদ্ধ করা নয়, এটি হলো বঙ্গবন্ধুর জীবনদর্শনের মৌলিক চেতনা। নারীকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য এমন একটি উদ্যোগ গ্রহণ মাত্র নয়, এটি দেশবাসীর সামনে নারীর সম্মান। সবাই যেন বীর নারীদের গৌরবের জায়গা থেকে সম্মান করে।

নারী পুনর্বাসন বোর্ডের দ্বারা নির্যাতিত নারীদের কর্মে উপযুক্ত করে গড়ে তোলার জন্য নানা ধরনের ট্রেনিং প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়। ঢাকার বেইলি রোডে স্থাপন করা হয় ‘উইমেন্স ক্যারিয়ার ট্রেনিং ইনস্টিটিউট’। এখানে তাদের বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। হস্তশিল্পসহ সেক্রেটারিয়েল কোর্স চলত।

১৯৭৪ সালে এই প্রতিষ্ঠানটি নারী পুনর্বাসন ও কল্যাণ ফাউন্ডেশনে রূপান্তর করে নারীদের পুনর্বাসন, শিক্ষা, কাজের সুযোগ ইত্যাদির পরিসর বাড়ানো হয়। এসব কাজের সূচনায় শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব নিজ উদ্যোগে ১০ জন বীরাঙ্গনার বিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন।

বঙ্গবন্ধু তাঁর সরকারের প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় (১৯৭৩-১৯৭৮) যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত নারীদের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করেন। এর মধ্যে রয়েছে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা ও সমাজকল্যাণমূলক কর্মসূচি। শুধু নির্যাতিত নারী নয়, শহীদের স্ত্রী, মেয়েদের চাকরি এবং অন্যান্য আনুষ্ঠানিক বিষয়ের ব্যবহার করা হয়; বিশেষ করে প্রশিক্ষণ। এই পরিপ্রেক্ষিতে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে চালু করা হয় নানা ধরনের প্রশিক্ষণ কর্মসূচি।

বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার পর জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে বাংলাদেশে নিয়ে এসেছিলেন কলকাতা থেকে। যত্ন ও গভীর পরিচর্যায় কবির অসুস্থতার দিনগুলো স্বস্তি ও আরামের হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু জানতেন কবির অসাধারণ দুটি কবিতার লাইন—‘বিশ্বের যা কিছু মহান সৃষ্টি চিরকল্যাণকর/অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।’ এভাবে একজন কবি নারীকে মহীয়ান করেছেন কবিতার ভাষায়। আর জাতির পিতা স্বাধীনতার স্বপ্নদ্রষ্টা নারীকে মহীয়ান করেছেন প্রশাসনের দ্বারা। তিনি সচেতনভাবে নারী-পুরুষের সমতার জায়গা নিজের দক্ষ প্রশাসনিক চিন্তায় এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রশাসনে, খেলাধুলায় মেয়েশিশু-নারীর সমতার জায়গা সমন্বিত করার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর হাতেই সামাজিক মূল্যবোধের অভাবে মেয়েশিশু, নারীর ধর্ষণের জায়গাটিও নিয়ন্ত্রিত হয়ে নারী নির্যাতন বন্ধ হবে। অপরাধী শাস্তি পেয়ে নিজেদের সংশোধন করবে—এই প্রত্যাশা সবার ছিল। তাঁর মৃত্যুর পর সব কিছু বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। বলতেই হবে বঙ্গবন্ধুর চেতনার ধারাবাহিকতা ২০২০ সালে বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে দীর্ঘায়িত হচ্ছে। এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ।

এই কুইজে


- জন
অংশগ্রহণ করেছেন
আপনিও রেজিষ্ট্রেশন করুন


the leader

the leader

২ এপ্রিল ২০২৩

আজ আপনার জন্য আর কোন পরীক্ষা নেই!

শিরোনাম:
   ডিএমপির নতুন কমিশনার, অতিরিক্ত আইজিপি হাবিবুর        জাতিসংঘ সদর দপ্তরে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সঙ্কট কাটিয়ে উঠতে আর্থিক ব্যবস্থার পুনর্গঠন চাইলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা        প্রতিদিনই আমরা খবরে দেখছি পেঁয়াজ ও রসুনের দাম বেশি।        উন্নয়ন ও সুশাসনের প্রতীক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা        দেশে ১০ বছরের প্রাকৃতিক গ্যাস মজুত আছে : জানালেন প্রতিমন্ত্রী        মার্কিন ছয় কংগ্রেসম্যানের চিঠি প্রত্যাহারের দাবি ১৯২ মার্কিন বাংলাদেশির        লাঙ্গল কার জানা যাবে রবিবার        আজকে বাংলাদেশে দরিদ্রতা নাই হয়ে গেছে: চুমকি        আরো আটশত মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ আসেছে দেশে : আশাবাদ সরকারের।        আড়াই হাজার দোকান পুড়ে ছাই, ক্ষতি ২০০০ কোটি টাকা        বৈশ্বিক মন্দা সত্ত্বেও দেশের অর্থনীতি গতিশীল রাখতে সক্ষম হয়েছিঃ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা        স্বল্পোন্নত দেশগুলো দান চায় না, তারা তাদের প্রাপ্য চায়ঃ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা        স্বায়ত্তশাসনসহ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মুক্তির ছয়টি দাবি : শেখ মুজিবুর রহমান।        মার্চের শুরুতেই বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রীয় কাঠামোর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে জাতিকে স্বাধীনতার প্রস্তুত জন্য করেন        বাংলাদেশ গেমসের সমাপনী দিনের মূল আকর্ষণ ছিল ১০০ মিটার স্প্রিন্ট।